এলাকাগতভাবে আমাদের নিকট প্রতিবেশী সদ্যপ্রয়াত মেহেরুন চৌধুরী। পৈতৃকবাস নীলফমারী‘র জলঢাকা উপজেলার বগুলাগাড়ি। বাবা মহিদুর রহমান চৌধুরী ওরফে এম আর চৌধুরী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মামাতো ভাই তিনি। নীরব অভিভাবক ছিলেন– জিয়াবিহীন অসহায় পরিবারে। সেই সূত্রে মেহেরুনের অবাধ যাতায়াত ছিলো বেগম জিয়া সকাশে।
২১ জুলাই‘২৫ মধ্যাহ্নে আকাশ ভেঙে পড়লো যেনো। ‘এফটি-৭’ নামীয় প্রশিক্ষণ বিমানের আকস্মিক পতন। পড়লো উত্তরার ‘মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে’র ওপর।মহাঅগ্নিকান্ডে মুহূর্তেই অগ্নিদাহের শ্মশানচিত্র। শত শত ছাত্র-ছাত্রীর আগুন ঝলসানো দেহ। মানবিক মন নিয়ে সেবাকাজে নেমে এলো মানুষ। দমকল বাহিনী, সেনাদল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনীতিকেরাও। শিক্ষক অভিভাবক, কলেজ-কর্মকর্তা, কর্মচারী। তবে সেবার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত রাখলেন শিক্ষক মেহেরুন চৌধুরী।
৪২ বছর বয়েসী মেহেরুন নিজেও ছিলেন অগ্নিদগ্ধ। শরীরের ৮০ শতাংশ ত্বক পুড়ে গেছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের মাতৃ-ভালোবাসা দিতে উদ্যোগী। ২০ টি অসহায় কিশোর-বিশোরীকে দ্রুত উদ্ধার করেন। আগুনের লেলিহান আঁচ থেকে বাঁচিয়ে দেন। কিন্তু নিজের জ্বলন্ড দেহকে দিতে পারেননি সুরক্ষা। ফলে, হাসপাতালের ‘বার্ণ ইউনিট’ বাঁচাতে ব্যর্থ হলো। মৃত্যুর অগ্নিসোপানে তিনি হয়ে উঠলেন ইতিহাস। ২১ জুলাই‘২৫ বা ১৪৩২-এর ৬ শ্রাবণ, সোমবার। সারা পৃথিবীর শিক্ষক-মাতৃত্বের এক ‘দৃষ্টান্ত দিবস।’
পৈতৃকবাসে ফিরে গেলো মেহেরুনের নিথর লাশ। দুঃখজনক হলেও– আমরা একই জেলার মানুষ। নীলফামারীতে আমাদের উপজেলা ডোমার, তাঁদের জলঢাকা। তিস্তা নদীর উপকন্ঠে বগুলাগাড়ি গ্রামে। পেশাগত কারণে ২০২৪-এর জানুয়ারিতে গিয়েছিলাম। নির্বাচনের বিতর্কিত পরিবেশ দেখতে। না, মেহেরুনেরা ভোট দিতে যায়নি, আগ্রহী নয়। জানতো, ভোট যথাযথভাবে হবে না। দেশে গণতন্ত্র ফিরলে ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টালো, সুযোগটি কাজে লাগলো না। মেহেরুনের পরিবারে শুধুই বিলাপ, আহাজারি।
বাবা এম আর চৌধুরী শহীদ জিয়ার মামাতো ভাই। ১৯৮১-এর ৩০ মে চট্রগ্রামে মর্মান্তিক মৃত্যু ‘জিয়া চাচা‘র। অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা। উত্তরাধিকার সূত্রে মেহেরুনও সেবক হয়ে ওঠেন। ১৯৯৫-এ কৃতিত্বসহ ম্যাট্রিক পাশ করেছেন। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শিক্ষকতার মহান পেশায় জড়ান। উত্তরার ‘মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে’ পেশাজীবন।
নিজে কখনও রাজনীতির সাথে জড়াননি। তবে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার ‘চোখের মনি।’ প্রায়শ রান্নাবান্না করে খাবার পৌঁছাতেন।’ বাঘা বাঘা নেতারা ‘ম্যাডাম’ বরাবর ভিড়তে পারতেন না। কিন্তু মেহেরিন চৌধুরীর ছিলো অবাধ যাতায়াত। বেগম জিয়ার জেলজীবনেও তিনি সেবা দিয়েছেন। কিন্তু কখনই প্রচারণার আলোতে নিজেকে নেননি।
২১ জুলাই-এর অগ্নিজ্বলা সেবাকর্মেও কোন প্রচার চাননি। প্রিয় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে আত্নাহুতির দৃষ্টান্ত হলেন। ফলে, সারা বিশ্ব আজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত। ফার্সি নাম ‘মেহেরিন’ মানে সূর্যময়, প্রেমময়। যেনো–
নিজের জীবন পুড়ে আলো দিলে অন্যে–
নতুন জীবন জাগে– স্মৃতি জনারণ্যে।
🧨অক্ষরবৃত্ত
🧧 জুলাই‘২৫ ss.generation71@gmail.com

