কি মিয়া নিউইয়র্কের আর খবর কি? কেমন আছে আমাদের কাদরী মিয়া?
কবি শহীদ কাদরী বিষয়ে বিশাল কৌতুহল– কবি আল মাহমুদের। বাংলা ভাষার আরেক কিংবদন্তী কবি তিনি। আশি-নব্বই দশকে আমরা ডাকতাম: কবিশ্রেষ্ঠ। দশকের ব্যবধানে দেখা হলো ২০১৫-এর প্রথমার্ধে। ঢাকার রমনা রেস্তোঁরায়, প্রবাস ফেরৎ আড্ডায়। অনলাইন প্রকাশনা ‘সেই বই’-এর মিলনমেলায়।

কবি আল মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রায় নয় বছর পর। আমাকে পেয়ে যেন আপ্লুত হলেন। চললো অনানুষ্ঠানিক কুশল বিনিময়। স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক কথাও হচ্ছিলো। প্রায় ৮০ বছরের ঝুলন্ত শরীর ওনার। কিন্তু কথা আর বিষয় ঝুলে যাচ্ছিলো না। আট মিনিটের মাথাতেই স্মৃতির আরেক ঝাঁপি। মার্কিন-প্রবাসী কবি শহীদ কাদরী প্রসঙ্গ।
কবি আল মাহমুদের প্রবল আগ্রহ অনুজ বন্ধুকে নিয়ে। বললেন, কাদরী মিয়ার নতুন খবর কিছু শোনাও। তোমরাতো মিয়া আড্ডার খনি‘রে পাইছো। গোটা নিউইয়র্ক মাতায় রাখছে নাকি?
বললাম, হ্যাঁ, তিনিইতো মধ্যমণি। তবে সমস্যা শরীর নিয়ে। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালোসিস করাতে হয়। রক্তবদল প্রক্রিয়া চলমান। তারপরও মানুষজন, ভক্তদের সময় দেন। বলা চলে প্রাঞ্জল থাকেন।
কি কও, প্রাঞ্জল? প্রাণ ও জল। ঠিক বলেছো, যেমন প্রাণবন্ত, তেমনি জলজ্যান্ত।
আল মাহমুদ আবার কৌতুক করেন। আরোপিতভাবে আমি অনেকটা বোকা সাজি। বলি, ভালো করে বুঝিয়ে বলেন।
ক্যান, সহজ কথাটা বুঝলানা? প্রাণবন্ত, মানে প্রাণ রসে পূর্ণ। আর জলজ্যান্ত মানেটা বুঝলা না? যা বলবে, মনে হবে মিথ্যার লেশমাত্র নাই। শ্লোক, মন্ত্র সব আওড়াতে পারে। মনি-ঋষির বাণী– গাছের পেয়ারার চেয়েও টসটসে তার কন্ঠে।
সাহিত্য বা কবিতা নিয়েও তো তিনি উচ্চকণ্ঠ। আমি সবিনয়ে যোগ করি।
আরে মিয়া, কবিতা ছাড়া তার ভাত আছে? একজীবনে বহুত চাকরি ধরছে ছাড়ছে। ‘সংবাদে’ এডিটোরিয়ালে ঢুকলো। অতিদ্রুত প্রস্থানও করলো। তবে হ্যাঁ, তিনটা বিষয় তার মজ্জাগত। পদ্য, প্রগল্ভতা বা প্রবল আড্ডাবাজি। আর প্রণয়, মানে তো নারী প্রেম। অই যে, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’।
অনেকে বলেন, এটা দেশকে নিয়ে লেখা।
প্রতিউত্তরে আল মাহমুদ বললেন, এটা কবির কৌশল। সাপও মারবে লাঠিও ভাঙ্গবে না। একটা ঘোরের মধ্যে কাদরী বইটি লিখেছিলো। সেই যুদ্ধ-উত্তর ৭৩-৭৪ সালের কথা। তার প্রাণ-প্রিয়া নাজমুন্নেসা পিয়ারী’র প্রেরণা ছিলো বইটিতে। প্রচ্ছদও করেছিলো সেই রসায়নের তরুণী অধ্যাপিকা। কবি শহীদ কাদরীকে নাগরিক প্রেমে মোহিত করেছিলো। বিয়ে সংসার-সন্তান সবই পেয়েছিলো বোহেমিয়ান কাদরী। কী বলবো, সে এক ‘তৃপ্তিবিধান পর্ব।’ পরে তো এক ‘সাদা-মেমে’র হাত ধরে লন্ডন থেকে আমেরিকা। বাকি ইতিহাসতো তোমরা জানো।
এক আশ্চর্য রসবোধ যেন রঙ ছড়াচ্ছে। বুঝলাম, প্রবীণ আল মাহমুদ যৌবনদীপ্ত শহীদ কাদরীকেই খুঁজছেন। বললাম, বস্টনে বুকে-চুকে গিয়েছিলো ‘সাদা-মেম’ পর্ব। এখনতো নিউইয়র্কে ‘নীরা পর্ব’ চলছে। আপনার ‘সোনালি কাবিন’ দিয়ে প্যারোডিও হয়েছে >>
বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল
পৌরুষ আবৃত করে জলপাইয়ের পাতাও থাকবে না;
তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল
জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা,
পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা;
দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।
“শহীদ কাদরী পেলো সুনীলের ছায়ানারী– ‘নীরা!’
আপনি এসব জানেন নিশ্চয়ই, কি বলেন?
কী বলো, জানবো না মানে! সুনীল গাঙ্গুলীতো অভিমান করে বসেছিলো। নিউইয়র্কে গিয়ে নাকি কাদরীর সাথে বইমেলা করেছে। সেখানেই পেয়েছে কাদরীর নতুন বউকে। নতুন হিরামতি‘র নাম নাকি ‘নীরা’। এখন বলো সুনীল বেচারা কই যায়। সারাজীবন ‘নীরা নীরা’ করে কবিতায় কোরাস গাইলো। আর সেই কাব্যদেবী সংসার করছে শহীদ কাদরী’র। জানিনা, মেয়েটির আসল নাম ‘নীরা’ কি না। সুনীলকে চমকে দেওয়ার জন্যেও কাদরী একটা জাদু দেখাতে পারে।

কবি শহীদ কাদরী ও নীরা কাদরী🔸নিউজব্যাংক
তবে আমরাতো জানি, ছোট ভাবীর আসল নাম ‘নীরা’ই। এ বিষয়ে কেউ কখনো বিতর্ক তোলেনি।
আমার কথা কেড়ে নিলেন কবি আল মাহমুদ। বললেন, সুনীল ২০১২-তে মহাপারে চলে গেছে। কিন্তু ‘নীরাতোষিত সাহিত্য-বিতর্ক’ কি থেমে গেছে। সে তো একই নমে কবিতা-গদ্য দু’টোই লিখলো। কী যেন নাম দিয়েছিলো বই দু‘টির?
‘হঠাৎ নীরার জন্যে’। প্রথমে কাব্যগ্রন্থ’, পরে আবার উপন্যাস। বললাম, দুটোই বাজার পেয়েছিলো। এগুলো তো আশি দশকের গল্প।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঐ তো তোমাদের হৈ চৈ-এর বিষয়-আশয়! তো তোমরা কি আসল ‘নীরা’কে খুঁজে পেয়েছিলে? অনেকে বলাবলি করলো নবনীতা দেব-সেন। সুনীলের প্রথম ব্যর্থ প্রেম। অমর্ত্য সেন-এর প্রথম স্ত্রী। তোমাদের নাকি আবার সাহিত্য-নেত্রী। ঐ জুটি একসময় বস্টনেই থাকতো। স্বামী-স্ত্রী দুজনই লেখক, অধ্যাপক। ঐ বস্টনেই তো কাদরী ‘সাদা-মেম’ নিয়ে থাকতো। ঐ বস্টনেই অমর্ত্য সেন নবনীতা’কে হারায়। ঐ বস্টনেই কাদরী ‘সাদা-মেম’ ছেড়ে বাঙালিনী ‘নীরা’কে খুঁজে পায়। তোমাদের আমেরিকায় কতো গল্পের ফল্গুধারা। তো কাদরী কি নতুন কিছু লিখছে? না কি শুধুই বধুপাঠে ব্যতিব্যস্ত?
আপনার কি ধারণা- শহীদ কাদরী এখনো লিখছেন? তিনিতো আপাদমস্তক একজন স্বদেশ-প্রেমিক মানুষ। তিনি বলছেন, একজন কবি বা সৃষ্টিকর্মীর নিজ-দেশ ছাড়তে নেই। তিনি মার্কিন নাগরিকত্বে আগ্রহী নন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফিরে পেতে চান। ঘরে ফেরার তাড়া নিয়ে কবিতাকর্ম সম্ভব? আপনি তো একাত্তরের যুদ্ধকালে ভারতে ছিলেন। তখন কি তেমন লিখতে পেরেছিলেন?

আমি আলোচনায় খানিকটা সিরিয়াস হলাম। কিন্তু কবি আল মাহমুদ আপন বিষয়ে অনঢ়। বললেন, প্রবাসে বসে কাদরী একটি বই লিখেছে। ‘চুম্বন’ বিশেষণ দিয়ে, কি যেন নামটি..।
‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দিও’। আরও বললাম, শিরোনামেও ছন্দ বহাল। ৩+৩+২ এবং ২+২, অক্ষরবৃত্ত।
কবি আল মাহমুদ রসাত্মক কণ্ঠে জবাব দিলেন। বললেন, বুঝলে হে, ‘চুম্বনতিলক কাব্য’। ঐ বই বলছে, কাব্যলগ্নের চেয়ে প্রণয়পরাধ ছেঁকে ধরেছে। বুঝলে, ‘নারী’ বদলের প্রতিটা বাঁকে পুরুষকে পরীক্ষা দিতে হয়। এই যে পাশে ছড়াকবি রফিকুল হক দাদুভাই বসে আছে। প্রথম পত্নী বিয়োগের পর নতুন নারীতে অবগাহন। নতুন সংসার মানে নতুন নতুন অভিনয়। নতুন জনকে জানান দিতে হয় তুমিই ততোপেক্ষা তিলোত্তমা। বৃঝলে, ‘অভিবাদন প্রিয়তমা’কে অতিক্রম করতে হয়। চুম্বনের অধিক আদরে সাজাতে হয় নবপ্রণয়ের তল, বহুতল। কাদরীর জীবন আসলে একদিকে আমুদে। অন্যদিকে অনেকটাই পরাবাস্তব। প্রেমিক-প্রেমিকাকে নিয়ে কি যেন লিখেছিলো। যা ছিলো নিজেরই জীবনবেদ। বলেছিলো শান্তি পাবে না, ঐ যে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে..
বন্য শুকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা,
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে সাদা,
ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ,
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকের সাথে ঠিকই
কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না পাবে না।
স্মৃতি থেকে পদাবলিটি পাঠ করলাম। কবি আল মাহমুদ যেন সতীর্থ কবিকে উপভোগ করলেন। বললেন, প্রেমিক কাদরী অসংখ্য প্রেম পেলো। প্রাণ-পূরণের প্রশান্তি কি পেলো? আসলে তার প্রগাঢ় প্রেম ছিলো পদ্যে। তাতে বিভোর থাকলে হয়তো এই জীবনবেদ ভিন্নতর হতো।
উল্লেখ্য, কবি আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী দু‘জনই প্রয়াত। প্রথমজনের জন্ম ১৯৩৬-এর ১১ জুলাই, ব্রাক্ষ্মবাড়িয়ায়। প্রয়াত হলেন ঢাকায় ২০১৯-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি। কবি শহীদ কাদরী‘র জন্ম পশ্চিমবঙ্গে, ১৪ আগস্ট ১৯৪২। প্রয়াত হলেন নিউইয়র্কে, ২৮ আগস্ট, ২০১৬-তে। কবি আল মাহমুদ সমাধিস্থ হয়েছেন পৈতকৃবাস ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। শহীদ কাদরী শুয়ে আছেন ঢাকার বুদ্ধিজীবী সমাধিপ্রাঙ্গনে।
দু’জনই ‘বাংলা একাডেমি’ পুরস্কার ও ‘একুশে পদক’প্রাপ্ত। শারীরিক উচ্চতাও প্রায় সমান সমান। পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে উভয়ের বন্ধুত্ব ছিলো জোড়-মানিকের। আল মাহমুদের সর্বাধিক আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন।’ পূর্ণাঙ্গ আকারে ঢাকায় প্রথম প্রকাশ ১৯৭৩-এ। শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শহীদ কাদরীকে উৎসর্গকৃত। তাতে উৎসর্গের বয়ানটি সচেতনমহলে আলোড়ন তোলে। ” আমাদের এককালের সখ্য ও সাম্প্রতিক কাব্যহিংসা অমর হোক। — ভবদীয় আল মাহমুদ, ঢাকা ১৯৭৩।

